Business is booming.

সাম্প্রদায়িক হামলা: হঠাৎ করে সংগঠিত অনাকাঙ্ক্ষিত এ ঘটনায় কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী

0

ঘটনার সূত্রপাত কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে। নগরীর নানুয়ার দীঘিরপাড়ের একটি দুর্গাপূজার মণ্ডপে কোরআন অবমাননার অভিযোগে উত্তেজনাটা শুরু হয়। এ ঘটনায় কয়েকটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে।

ঘটনাটি ফেসবুকে প্রথমে লাইভ করেছিলেন কে? জাতীয় জরুরি নাম্বার ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন কে? পূজামণ্ডপে কোরআন শরীফ কে বা কারা নিয়ে গিয়েছিল? সাম্প্রদায়িক উসকানি ও হামলার পেছনে সংগঠিত কোনো অপশক্তি কি কাজ করেছে?

চারটি প্রশ্নের মধ্যে প্রথম দুইটির উত্তর খুঁজে পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জানা গেছে, বাকি প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে পুলিশ।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ অক্টোবর সকালে নগরীর নানুয়া দীঘির উত্তর পাড়ে পূজামণ্ডপের ঘটনাটি জেলার সদর উপজেলার রঘুরামপুর গ্রামের মৃত আবদুল করিমের ছেলে মো. ফয়েজ আহমেদ (৪১) ফেসবুক লাইভে প্রচার করেন।

দৃশ্যটি লাইভে প্রচার ও মোবাইল ফোনে ধারণ করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে ওইদিন রাতে পুলিশ তাকে আটক করে। পরে পুলিশ বাদী হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তাকে আসামি করে মামলা করে। এ মামলায় বর্তমানে রিমান্ডে রয়েছেন তিনি।

এছাড়া, এদিন সকালে নানুয়ার দিঘির পাড়ে পূজা দিতে আসা দু’জন নারী ভক্ত প্রথম কোরআন শরিফটি দেখতে পান। এ নিয়ে তারা বিস্ময় প্রকাশের সময় ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন ইকরাম হোসেন (৩০) নামে এক যুবক। তিনিই ঘটনাস্থল থেকে ৯৯৯-এ কল করেন। তারপর ওসি আনওয়ারুল আজিম ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি কোরআন শরিফটি উদ্ধারের পাশাপাশি ইকরামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে থানায় নিয়ে যান। তদন্তসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, ইকরাম নগরীর কাশারিপট্টির রিকশাচালক বিল্লাল হোসেনের ছেলে। ইকরাম বিবাহিত হলেও স্ত্রীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। মাদকাসক্ত হওয়ায় তিনি পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন। ইকরাম পাইপ মিস্ত্রির কাজ করেন।

অন্যদিকে, দারোগাবাড়ী মাজারের মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন এমন তিনজনকে ঘটনার পর থেকে দেখা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে দু’জনকে আটক করেছে পুলিশ।

কুমিল্লা জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘মাজারে নিয়মিত যাওয়া তিন যুবকই মণ্ডপে কোরআন রাখার পরিকল্পনায় জড়িত। তাদের মধ্যে দু’জনকে আমরা আটক করেছি। জিজ্ঞাসাবাদে তারা অনেক তথ্য দিয়েছে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজেও ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি। তৃতীয় যুবককে আটক করতে পারলে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। কারণ তিনিই সরাসরি মণ্ডপে কোরআন রেখেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার বয়স ৩৫- এর কাছাকাছি। তাকে ধরতে আমাদের অভিযান চলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নানুয়া দীঘির উত্তর পাড়ে সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির প্রয়াত নেতা আকবর হোসেনের বাড়ি। ওই বাড়ির সামনেই অস্থায়ী পূজামণ্ডপটির অবস্থান ছিল। দীঘির দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মনিরুল হকের বাড়ি। এলাকাটি একসময় কুমিল্লা শহরের অভিজাত এলাকা ছিল।

জানা গেছে, মণ্ডপ থেকে পবিত্র কোরআন শরীফ উদ্ধার এবং ঘটনাটি ফেসবুকে লাইভ করার পরই কম বয়সী ছেলেরা জমায়েত হতে থাকে। সেদিন বিক্ষোভ করতে আসা লোকজনের বেশির ভাগই ছিল বয়সে তরুণ, অচেনা। তাদের মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কী, বোঝা যাচ্ছিল না। একেকজন একেক দাবি করছিল। শুরুতে জমায়েত হওয়াদের বেশির ভাগের দাবি ছিল, নানুয়া দীঘির পাড়ে পূজামণ্ডপ বন্ধ করে দিতে হবে। দুই একজন মণ্ডপ ভেঙে ফেলার দাবি তুললে উত্তেজনা ছড়াতে থাকে। তাদের শান্ত করতে আশপাশের মসজিদের মাইকে আহ্বান জানানো হয়। এরপরও কীভাবে যেন তা পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে।

কুমিল্লা মহানগর পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি ও মহানগর আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক শিবপ্রসাদ রায় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, স্থায়ী মন্দির না হওয়ায় ওই মণ্ডপ রাত দুইটার পর অরক্ষিত থাকত। এ সুযোগই নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তার দাবি, কুমিল্লার ঘটনাটি জাতীয় ষড়যন্ত্রের অংশ। স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দারা এগিয়ে না এলে সেদিন আরও বড় ক্ষতি হতে পারত।

এদিকে, সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় এখন পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৭২টি। এসব মামলায় জ্ঞাত ও অজ্ঞাতনামা আসামি অন্তত ২০ হাজার। গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রায় ৫০০ জনকে।

এই অবস্থায় সারাদেশের পুলিশের ইউনিটগুলোর প্রধান থেকে শুরু করে জেলার পুলিশ সুপারদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছেন সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা। বৈঠকে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে হার্ডলাইনে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.