Business is booming.

মাধ্যমিকে প্রধান শিক্ষক নিয়োগে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ‘আর্থিক লেনদেনের’ তথ্য প্রকাশ: টিআইবি

0

এর বাইরে অন্যান্য নিয়োগ, বদলি, নতুন পাঠদান, শ্রেণি শাখা, বিভাগ ও বিষয় অনুমোদন এবং শিক্ষকদের উচ্চতর স্কেল অনুমোদনেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

বুধবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশকালে এসব তথ্য তুলে ধরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ- টিআইবি।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।

টিআইবি বলছে, এসব অনিয়মে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সদস্য, প্রধান শিক্ষক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কর্মকর্তা-কর্মচারী, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এছাড়া পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি।

মাউশি ও এর অধিনস্ত কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, পরিচালনা কমিটি, অন্যান্য অংশীজন, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যম কর্মীসহ ৩২৫ জন ‘মুখ্য তথ্যদাতার’ সাক্ষাকারের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে টিআইবি।

এছাড়া মাউশির বিভিন্ন কার্যালয় এবং ৫৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে সংস্থাটি।

নীতিমালা লঙ্ঘন করে অনিয়মের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়।

এতে বলা হয়, মাধ্যমিক পর্যায়ের এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগে সাড়ে তিন লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হচ্ছে।

এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষকসহ কয়েকটি পদে নিয়োগ প্রদান করে ব্যবস্থাপনা কমিটি। আর বিষয়ভিত্তিক সহকারী শিক্ষক ও প্রভাষক নিয়োগ দেয় এনটিআরসি।

এসব নিয়োগে পরিচালনা কমিটির রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ আদায়ের তথ্য এসেছে প্রতিবেদনে।

এক্ষেত্রে এনটিআরসিএ এর সুপারিশ করা সহকারী শিক্ষকের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগদানে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। সহকারী গ্রন্থাগারিক নিয়োগে দুই থেকে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়।

এছাড়া শিক্ষক এমপিওভুক্তিতে ৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা এবং শিক্ষক বদলিতে এক থেকে দুই লাখ টাকা লেনদেনে মাউশির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জড়িত বলে গবেষণার তথ্যে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে টিআইবি। অর্থ না দিলে শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তি ঝুলে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষায় ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা লেনদেন করেন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নতুন পাঠদান অনুমোদনে তদবির করতে হয়। শ্রেণি শাখা, বিভাগ, বিষয় অনুমোদন এবং শিক্ষকদের উচ্চতর স্কেল অনুমোদনে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

পাঠদান অনুমোদনের ক্ষেত্রে ১ থেকে ৫ লাখ টাকা লেনদেন করছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান ও একাডেমিক স্বীকৃতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের মাধ্যমে হয়ে থাকে।

টিআইবি জানিয়েছে, প্রাপ্যতা না থাকলেও রাজনৈতিক সুপারিশে পরিদর্শন ছাড়াই এক্ষেত্রে অনুমোদন দেওয়া হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণেও অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

স্বীকৃতি নবায়নের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করেন শিক্ষা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী

প্রতিবেদনে জানানো হয়, একই প্রতিষ্ঠানে চাকরির তিন বছর পর শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বদলির বিধান থাকলেও তা করা হয় না। কোচিং বাণিজ্যসহ অন্যান্য সুবিধা নিতে তদবির করে বদলি বা একই স্থানে অবস্থান করছেন অনেকে।

এছাড়া কেনাকাটায় অতিরিক্ত বিল তৈরি, পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ দেওয়া, প্রশিক্ষণে অনিয়মসহ নানা অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সুপারিশে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় জাল সনদ, নিয়োগে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাতসহ অন্যান্য অনিয়ম থাকার কথা জানিয়ে টিআইবি।

অনিয়ম থাকার পরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রতিবেদন দিতে উপরের মহলের প্রভাব খাটানো হয়। পাশাপাশি দুর্বলতা ঢাকতে পরিদর্শককে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন অর্থ প্রদান করে, তেমনি পরিদর্শকও নানা উপায়ে অর্থ আদায় করেন। একইসঙ্গে প্রধান শিক্ষক পরিদর্শকের ভয় দেখিয়ে অন্য শিক্ষকদের থেকে অর্থ আদায় করেন।

টিআইবি বলছে, ‘অনেক অশিক্ষিত লোক’ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় শিক্ষকদের সঙ্গে কমিটির সমস্যা ও দ্ব্ন্দ্ব সৃষ্টি হচ্ছে বলেও দাবি টিআইবির।

প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে পদক্ষেপের ঘাটতিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তার হচ্ছে। শিক্ষা কার্যক্রম প্রক্রিয়ায় দীর্র্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির যে অভিযোগ তাতে অনেকক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রতিষ্ঠানিকীকরণ হয়েছে।

অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে এমপিওভুক্তির অনলাইন সফটওয়্যার আরও সহজ করা এবং ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা, এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যায়ক্রমে জাতীয়করণ করা, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করার সুপারিশ করেছে টিআইবি।

সুপারিশে দরপত্র, কার্যাদেশ, প্রকল্পের ক্রয় ও নিরীক্ষা সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে বলা হয়েছে।

এছাড়া শিক্ষানীতি-২০১০ অনুযায়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে অতি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খসড়া নিয়োগবিধি চূড়ান্ত করতে বলেছে টিআইবি।

পাশাপাশি বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধা সামাজিক বাস্তবতায় বৃদ্ধি করা, দ্রুত অবসর ভাতা প্রদানে বাজেটে বরাদ্দ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

টিআইবি নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষকদের অধিকতর দক্ষ করে তোলা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতে বৈষম্য দূর করতে ব্যবস্থা নিতে বলেছে।

টিআইবি জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে ধনী-গরিব এবং শহর-গ্রামের মধ্যে শিক্ষা পাওয়ার বৈষম্য প্রকট হয়েছে, অনেকে ঝরে পড়েছে। এজন্য ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনা, শেখার ঘাটতি পূরণে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে বলেছে সংগঠনটি।

Leave A Reply

Your email address will not be published.